জাতীয় প্রেস ক্লাব ও শিক্ষা ভবনের মধ্যকার মোড়ে কদম ফোয়ারার দক্ষিণে চারটি বাঁশের খুঁটির ওপর নড়বড়ে অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে বিশালাকৃতির দুটি রঙিন বিলবোর্ড। তাতে শোভা পাচ্ছে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হাজি মো. সেলিমের স্মিতহাসির ছবি। সে সঙ্গে রয়েছে লাল-সবুজের তারকাখচিত আওয়ামী লীগের একটি পতাকা। ওপরের এক কোণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি। এরই মধ্যে সাদা রঙে লেখা ‘জনগণই আমার শক্তি’- হাজি মো. সেলিম, সংসদ সদস্য, ঢাকা-৭, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ। প্রচারে এলাকাবাসী।
দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না, বাঁশের খুঁটির ওপর নির্মিত এই বিলবোর্ড দুটি সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে অনুমতি না নিয়ে অবৈধভাবে স্থাপন করা হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেও (ডিএসসিসি) খোঁজ নিয়ে এর সত্যতা পাওয়া গেছে। এ প্রসঙ্গে হাজি মো. সেলিম সমকালকে বলেন, সিটি করপোরেশন বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তিনি বিলবোর্ড ভাড়া নেননি। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে তার নামে কারা বিলবোর্ড লাগিয়েছে, সেটাও তিনি জানেন না।
কেবল হাজি মো. সেলিমেরই নয়, ঢাকার দুটি সিটি করপোরেশনের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে এখন বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুনে প্রার্থীদের প্রচারণায় সয়লাব হয়ে গেছে রাজধানী ঢাকা। ঢাকার অনেক স্থানে এখন শোভা পাচ্ছে মেয়র প্রার্থী সাঈদ খোকন ও আনিসুল হকের নামে স্থাপিত বিলবোর্ড। উত্তরা থেকে যাত্রাবাড়ী ও গাবতলী থেকে রামপুরার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ব্যানার-বিলবোর্ডের মাধ্যমে সম্ভাব্য মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের নানা স্লোগান ও নানা চেহারার ছবি দিয়ে চলছে দলীয় ও নগরবাসীর সমর্থন আদায়ের চেষ্টা।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সিটি করপোরেশন থেকে প্রতিবছর জুলাই-জুন মাসের জন্য রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে বিলবোর্ড তৈরির অনুমতি নেয়। ওই সব প্রতিষ্ঠান বিলবোর্ড তৈরি করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে বিভিন্ন মেয়াদে ভাড়া দেয়। অভিযোগ উঠেছে, প্রার্থীরা বিলবোর্ড ব্যবসায়ীদের কাছে থেকে সেগুলো ভাড়া না নিয়েই তাদের প্রচারণার কাজে ব্যবহার করছেন। প্রচারে এলাকাবাসী, আমরা ঢাকা, ওয়ার্ডবাসী, ঢাকাবাসী, ওয়ার্ড সভাপতি_ এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করলেও আদতে প্রার্থীদের উদ্যোগে বা সম্মতিতেই সেগুলো স্থাপন করা হয়েছে। এসব প্রার্থীই ভবিষ্যতে মেয়র বা কাউন্সিলর হবেন, কাজেই বাধা দিলে ভবিষ্যতে ব্যবসা করাই কঠিন হয়ে পড়ার ভয়ে তারাও কিছু বলছেন না। কারণ, ভবিষ্যতে বিলবোর্ডের অনুমোদন নিতে হলে তাকে সিটি করপোরেশনেই যেতে হবে; বরং তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত এই স্বল্প সময়ের জন্য কোনো ঝামেলায় যেতে চাইছেন না। আর প্রার্থীরা বলছেন, এসব বিলবোর্ড তারা লাগাননি। কে লাগিয়েছে, তা-ও তারা জানেন না। তাদের ধারণা, সমর্থক বা দলীয় কর্মীরা এ কাজ করে থাকতে পারেন।
বিলবোর্ড ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ আউটডোর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও নেপচুন অ্যাড-এর মালিক রফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, যারা ঢাকা শহরের অভিভাবক হবেন, তারা এমনভাবে বিলবোর্ড দখল করবেন, এটা তিনি বিশ্বাস করতে চান না। তার কয়টা দখল হয়েছে, সেটাও তিনি বলতে রাজি নন।
তবে সংগঠনের দপ্তর সম্পাদক মিজানুর রহমান সমকালকে বলেন, ‘এর আগে ঢাকা মহানগর যুবলীগের সম্মেলনের সময় একই ঘটনা ঘটেছিল। এবারও বিলবোর্ডগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে তারা কাউকে জিজ্ঞাসা করেননি। ভাড়া নেওয়া দূরের কথা, এ নিয়ে বহুবার বহু জায়গায় বলেছি। কোনো সুরাহা হয়নি। কাজেই যেটার কোনো সমাধান নেই, সেটা বলে লাভ কী। অথচ আমার বিলবোর্ড দখল করে নেওয়ায় একজন ক্লায়েন্ট তাদের পারচেজ অর্ডার ক্যানসেল করার হুমকি দিয়েছে। কিন্তু আমার করার কিছু নেই। এর আগে একবার সংবাদ সম্মেলন করেছিলাম। কিন্তু এখন তো আমরা অসহায়।’
আরেক বিলবোর্ড ব্যবসায়ী বন্ধু মিডিয়ার স্বত্বাধিকারী কাজী মাহবুব আলম সমকালকে বলেন, ‘আমার ছয়টা বিলবোর্ড তারা দখল করেছে। এর মধ্যে কোনোটাই আমার কাছ থেকে ভাড়া নেয়নি। কোনো কিছু জিজ্ঞাসাও করেনি। নাগরিক কমিটি, না কোন কমিটি লাগিয়েছে। সেই নাগরিক কমিটির লোকজনকেও তো চিনি না। তাহলে যাব কার কাছে? এখন নীরবে সহ্য করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের রাজস্ব বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, রাজধানীতে অসংখ্য অনুমোদনহীন বিলবোর্ড রয়েছে। ওই সব বিলবোর্ডও অনেক প্রার্থী দখল করে তাদের প্রচারণা চালাচ্ছেন। অনুমোদনহীন বিলবোর্ড চেনারও একটি উপায় আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বৈধ বিলবোর্ডের খুঁটিতে বা এক কোণে ওই বিলবোর্ডের অনুমোদনের একটি স্মারক নম্বর হলুদ রঙে উল্লেখ করা থাকে। যেটাতে স্মারক নম্বরের উল্লেখ নেই, সেটাই অবৈধ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর হেয়ার রোডে ফুটপাতের ওপরে বিলবোর্ডে একটি শিশুকে আদর করা অবস্থায় প্রার্থী সাঈদ খোকনের ছবি। সেখানে লেখা, ‘আসুন, শিশুর সুস্থ বিকাশে সহায়ক নগরী গড়ে তুলি।’ নিচে লেখা- সাঈদ খোকন। জনতার প্রার্থী, আপনার প্রার্থী। প্রচারে সুনাগরিক। কিন্তু এই সুনাগরিক সংগঠনের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ওই বিলবোর্ডের কোথাও স্মারক নম্বরও নেই।
এ প্রসঙ্গে মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী সাঈদ খোকন সমকালকে বলেন, ‘কর্মী-সমর্থকরা লাগিয়ে থাকতে পারে। যারা নির্বাচন করেন, তাদের পক্ষে অনেক মানুষ কাজ করেন। কোন সমর্থক বা শুভানুধ্যায়ী এসব বিলবোর্ড লাগিয়েছে, তা জানি না। তবে যদি আইন ভঙ্গ করে বা দখল করে এগুলো লাগানো হয়ে থাকে, তাহলে তাদের প্রতি অনুরোধ করব, বিলবোর্ডগুলো যেন তারা নামিয়ে ফেলেন। এ ছাড়া আমার করণীয় কিছু নেই।’
একাধিক বিলবোর্ড ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিশেষ করে যেসব বিলবোর্ড খালি অবস্থায় আছে, সেগুলোই দখলের কবলে পড়ছে বেশি। হঠাৎ করে দেখা যাচ্ছে, সেখানে একজন প্রার্থীর ছবিসংবলিত প্রচারণা। এ রকমই একটা বিলবোর্ড দেখা গেছে মিরপুর ১০ নম্বর থেকে ১১ নম্বরের দিকে এগোতেই ফুটপাতে। সেখানে কামাল মজুমদারের মধ্য বয়সের ছবি দিয়ে লেখা, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল আহমেদ মজুমদারকে মেয়র পদে দেখতে চাই। সৌজন্যে ঢাকা উত্তর নগরবাসী।’ এ ব্যাপারে ফোনে একাধিকবার কামাল মজুমদারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
রাজধানীর সোনারগাঁ মোড়ে দেখা গেছে, একটি বিলবোর্ডে জাতীয় পাটির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাইফুদ্দিন আহম্মেদ মিলনের ছবিসংবলিত নগরবাসীর প্রতি তার আহ্বান, ‘নিজের বিবেককে প্রশ্ন করুন। কষ্ট করে লাইনে দাঁড়িয়ে খারাপ লোককে ভোট দেবেন না।’ স্থানীয়রা জানান, কয়েক দিন আগেও ওই বিলবোর্ডটিতে বিএসআরএম এক্সট্রিম নামের একটি রড কোম্পানির বিজ্ঞাপন শোভা পাচ্ছিল। হঠাৎ করেই সেখানে মিলনের ছবি ভেসে উঠেছে।
এ প্রসঙ্গে হাজি সাইফুদ্দিন আহম্মেদ মিলন সমকালকে বলেন, তিনি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বা সিটি করপোরেশনের কাছ থেকেও কোনো বিলবোর্ড ভাড়া নেননি। কে তার নামে বিলবোর্ড লাগিয়েছে, তা তিনি জানেন না। তার দলের পক্ষে প্রচারণা চালানো ব্যক্তিরা লাগিয়ে থাকতে পারে। সেটা খোঁজ নিয়ে দেখবেন, তারা ভাড়া নিয়ে লাগিয়েছে কি-না। ভাড়া না নিলে তিনি নিজেই সেটা নামানোর ব্যবস্থা করবেন।
রাজধানীর কালশীতে মিরপুর বাইপাসের সংযোগস্থলে দেখা গেছে আনুমানিক ২০ ফুট বাই ৪০ ফুট আয়তনের একটি বিলবোর্ডে সাবেক ব্যবসায়ী নেতা আনিসুল হকের ছবি। তাতে লেখা, ‘বায়ুদূষণে বছরে মারা যায় ১৫ হাজার মানুষ। ড্রেন নেই ঢাকার ৬০ ভাগ এলাকায়। পরিবেশদূষণ সমস্যা চিহ্নিত। এবার সমাধানের যাত্রা। আনিসুল হককে মেয়র নির্বাচনে সমর্থন দিন।’ নিচে লেখা ‘আমরা ঢাকা’। স্থানীয়রা জানান, ওই বিলবোর্ডটি অনেক দিন ধরেই খালি ছিল। সেখানে এটা লাগানো হয়েছে। কিন্তু এমন দুর্বলভাবে লাগানো হয়েছে, একটু ঝড়োবাতাস হলেই সেটি খুলে পড়তে পারে। এ ছাড়া এয়ারপোর্ট রোডের প্রায় সর্বত্রই দেখা গেল, সড়ক বিভাজকের সড়কবাতির খুঁটিতে ‘আমরা ঢাকা’র ব্যানারে অসংখ্য ফেস্টুন। প্রতিটিতেই লেখা, ‘আনিসুল হককে মেয়র নির্বাচনে সমর্থন দিন।’
প্রসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বি এম এনামুল হক সমকালকে বলেন, আনিসুল হকের পক্ষ থেকে ডিএনসিসির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। জানিয়েছিলেন, কিছু বিলবোর্ড তিনি ভাড়া নিতে চান। বিলবোর্ড ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। এর পর আর তিনি যোগাযোগ করেননি।’ এ প্রসঙ্গে আনিসুল হক সমকালকে বলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রার্থী। এ জন্য অনেকেই তাকে বিনা ভাড়ায় বিলবোর্ড দিতে চেয়েছেন। কিন্তু তিনি সেটি করেননি। বিলবোর্ড ব্যবসায়ীদের কোনো অভিযোগ না থাকলে মিডিয়ারও এ বিষয়ে অভিযোগ থাকার কথা নয়। কতগুলো বিলবোর্ড কত টাকায় ভাড়া নিয়েছেন, সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টাকার পরিমাণ মূল বিষয় নয়। পাঁচ টাকা হলেও তাদের দিয়েছি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আনছার আলী খান সমকালকে বলেন, অনুমোদিত বিলবোর্ডে কে কী প্রচারণা চালাল, সেটা দেখার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের নয়। তবে অবৈধ বিলবোর্ড-ব্যানার-ফেস্টুন উচ্ছেদ অভিযান দ্রুতই তারা শুরু করবেন।