চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা উদ্বোধন করছেন বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ -সুপ্রভাত
আইএস, তালেবান ও আল কায়েদার স্টাইলে যারা মায়ের বুক খালি করছে তাদের সঙ্গে সংলাপ হবে না এবং নির্বাচনের জন্য ২০১৯ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। শতবর্ষী বাণিজ্য সংগঠন চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিসিসিআই) আয়োজিত মাসব্যাপী ২৩তম চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা (সিআইটিএফ) উদ্বোধন অনুষ্ঠানে গতকাল সন্ধ্যায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এ কথা জানান।
সরকারের সিনিয়র এ মন্ত্রী বলেন, ‘২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছি যাতে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। প্রধানমন্ত্রী দিতেন সংলাপের প্রস্তাব, খালেদা দিতেন আলটিমেটাম। গণভবন থেকে টেলিফোনে প্রধানমন্ত্রীর সংলাপের সময় খালেদা জিয়া যে আচরণ করেছেন, ওপার থেকে ককর্শ-কঠিন কথা বললেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তিনি নির্বাচন বয়কট করলেন তা নয়, সকল প্রচেষ্টা করলেন যাতে নির্বাচন হতে না পারে। ৫০০ স্কুলে আগুন দিয়েছেন। সেদিন যদি জাতীয় নির্বাচন করতে না পারতাম তবে দেশ তৃতীয় শক্তি বা অসাংবিধানিক শক্তির হাতে চলে যেত।’
তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ‘২০০৬ সালে রপ্তানি ছিল ১০ বিলিয়ন ডলার এখন হয়েছে ৩০ দশমিক ১৯ বিলিয়ন। তখন রেমিট্যান্স ছিল ৩-৪ বিলিয়ন, এখন ১৫ বিলিয়ন এবং রিজার্ভ ২৩ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের এই যে অগ্রগতি, উন্নয়ন এসব ভালো লাগে না একজনের। তিনি বেগম খালেদা জিয়া। আমি ঢাকা থেকে বিমানে এসেছি। কোনো অবরোধ নেই। ঢাকার বাসা থেকে মন্ত্রণালয়ের যেতে দুই ঘণ্টা আগে বের হতে হচ্ছে। কোনো হরতাল নেই। হরতালকেও ভোঁতা করে ফেলেছেন খালেদা জিয়া।’
সহিংসতার চিত্র তুলে ধরে ঊনসত্তরে রাজপথ কাঁপানো এ ছাত্র নেতা বলেন, ‘রিকশাযাত্রী মা-বোনদের ওপর পেট্রোলবোমা মারা হচ্ছে। আড়াই বছরের নিষ্পাপ শিশু রাফি ঘরের আগুনে পোড়ার পর সুস’ হয়ে বাড়ি ফেরার সময় তাকে দ্বিতীয়বার পোড়ানো হলো। কার বুক খালি করছেন খালেদা জিয়া। নিজের ছেলের মৃত্যুর পর দেশে লাশ আসলেও হরতাল দেন কেন? অতীতে বারবার পরাজিত হয়েছেন। এবারও তিনি পরাজিত হবেন। তার জেতার কোনো সম্ভাবনা নাই।’
চা বোর্ড কখনোই যাবে না
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘চা বোর্ড কখনোই চট্টগ্রাম থেকে যাবে না, যায়নি। চেম্বার সভাপতি মাহবুব আমাকে বিষয়টি জানানোর পর আমি মন্ত্রণালয়ে খবর নিয়ে জেনেছি এটা। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের হেড অফিস ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব এসেছিল গতকাল কিন’ প্রধানমন্ত্রী প্রত্যাখ্যান করেছেন। চট্টগ্রাম একটি ডিভিশনার হেড কোয়ার্টার। এখানে থ্রি স্টার হোটেল আছে। ফাইভ স্টার হয়েছে। আরেকটি হবে।’
কোরিয়ান ইপিজেড প্রসঙ্গ
চেম্বারের সহ সভাপতি সৈয়দ জামাল আহমেদের বক্তব্যের সূত্র ধরে মন্ত্রী বলেন, ‘স’ানীয় জনগণের ক্ষতি হয় বা বিদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ নাই এমন খারাপ সিগন্যাল যাতে না যায় এটি লক্ষ রেখে প্রধানমন্ত্রী বাস্তব পদক্ষেপ নেবেন।’
বিসিআইএম করিডোর চুক্তি শিগগির
আগে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া স্লোগান দেওয়া হতো উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘এখন সব উন্নয়ন হবে টেকনাফ থেকে চট্টগ্রাম। এ সড়কের দুপাশে গড়ে উঠবে শিল্প কারখানা। বাংলাদেশ, চীন, মায়ানমার, ভারত (বিসিআইএম) ইকোনমিক করিডোর চুক্তি আমরা সই করতে যাচ্ছি। চীনের কুনমিং থেকে ভারতের দিল্লি পর্যন্ত সংযোগ স’াপিত হবে। এটি হলে বাংলাদেশ কোথায় চলে যাবে! সরকার দেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প ৩৬ কোটি টাকার মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর, চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন, কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ, রিফাইনারির ক্যাপাসিটি বৃদ্ধিসহ অনেক উদ্যোগ নিয়েছে। স্পেশাল ইকোনমিক জোনের জন্য যে ১৭টি এলাকা চিহ্নিত করেছি তার মধ্যে দুটি চট্টগ্রামে।’
জাপান চায় গাজীপুর
মন্ত্রী বলেন, ‘অনানুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক রাজধানী হয়ে আছে চট্টগ্রাম। আমাদের আমদানি-রপ্তানি হয় চট্টগ্রাম দিয়ে। চট্টগ্রামকে আরও আধুনিক, মজবুত ও সুন্দর করার জন্য বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তরিক। স্পেশাল ইকোনমিক জোনে অনেক বিদেশি বিনিয়োগ আসবে। চীনারাই আমাকে বলেছে, বাংলাদেশ হবে তৈরি পোশাকশিল্পের শীর্ষ দেশ। এখানে আসার আগে একজন উদ্যোক্তা ফোন করে আমাকে বলেছেন, একটি চীনা কোম্পানির সঙ্গে এমওইউ সই হয়েছে-তারা বড় শিল্প গড়তে চায়। জাপান ঢাকার কাছে গাজীপুরে জায়গা চায়। আমরা মিরসরাই নিতে বলেছি।’ মন্ত্রী চট্টগ্রামের প্রয়াত সিনিয়র আওয়ামী লীগ নেতাদের স্মরণ ও স্মৃতিচারণ করেন।
প্রসঙ্গ ফাইভ স্টার
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ভূমি প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমি একথা আনন্দের সঙ্গে বলতে পারি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, গণতন্ত্রের মানসকন্যা শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে চট্টগ্রামের যে উন্নয়ন হয়েছে তা বিগত কোনো সরকারের আমলে হয়নি। চট্টগ্রামে ফ্লাইওভার হচ্ছে। এই প্রথম ফাইভ স্টার হোটেল হয়েছে। সেদিন প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করেছেন এটি। এত বেশি সুন্দর হয়েছে আমার মন জুড়িয়েছে। একটি ফাইভ স্টার আরও ফাইভ স্টার নিয়ে আসবে। কলকাতায় ১৯৯৫-৯৭ সালে হঠাৎ করে বেশ কিছু ফাইভ স্টার চলে আসলো। আমরা তখন হাসছিলাম। বাংলাদেশ থেকে গেলে ১০০ ডলারের নিচে থাকতে পারবো। আজ কলকাতায় ৭-৮টি ফাইভ স্টার। সবসময় বুক থাকে। আমার জানা মতে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে একটি ফাইভ স্টার আসছে।’
বিমানবন্দর সম্প্রসারণ হবে
সরকার বিমানবন্দর সম্প্রসারণের চিন্তা করছে উল্লেখ করে ভূমি প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে আগামী পাঁচ বছরে দ্বিগুণ হবে ট্রাফিক। এখনই সময় সম্প্রসারণের। সেদিন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হেলিকপ্টারে আসার সময় বলেছি, এয়ারপোর্ট সম্প্রসারণ করার সময় এসেছে। ইকোনমিক গেটওয়ে চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম বন্দরের কারণেই এ গুরুত্ব। চট্টগ্রামকে দিয়ে বাংলাদেশের চিন্তা করতে হবে। বিল্ড অপারেটর অ্যান্ড ট্রান্সফার (বিওটি) পদ্ধতিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেস ওয়ে করতে হবে আমাদের। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক থেকে টাকা না নিয়ে দুবাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরের কিছু কোম্পানি আছে যারা বিওটি পদ্ধতিতে এটি নির্মাণ করতে পারে। ২০ বছরের চুক্তিতে এটি হতে পারে। মাহাথির মালয়েশিয়ানদের পয়সায় উন্নয়ন করেনি, বিওটি পদ্ধতিতে করেছেন।’
সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ তারেক জিয়াকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘তাকে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলতে চাই, জাতির পিতা একদিনে বঙ্গবন্ধু হয়নি। তার উদ্দেশে বলবো, মুক্তিযুদ্ধকালীন তার পিতার কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেক প্রশ্ন আমাদের কানে আসছে তা কী সত্যি?’
এমপি লতিফ জানতে চাইলেন
বিশেষ অতিথি তিন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স’ায়ী কমিটির সদস্য এমএ লতিফ খালেদা জিয়ার উদ্দেশে বলেন, ‘বেঘোরে মানুষ খুন করে কোন জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠান করতে চায়-এটি জানতে চাই। আপনি ক্ষমতায় আরোহন করবেন? আপনার অভীষ্ট লক্ষ্য কী জনগণকে জানাতে হবে। আপনি একেক সময় একেক কথা বলেন। স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে দ্বিতীয় পাকিস্তান বানাতে চান। পেট্রোলবোমা আবিষ্কার করেছেন। মনে রাখবেন-সহনশীলতাই গণতন্ত্রের প্রথম পাঠ।’ নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে চেম্বার নেতাদের আরও সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান সাবেক এ চেম্বার সভাপতি।
চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সিআইটিএফের চেয়ারম্যান, সিসিসিআইর সিনিয়র সহসভাপতি মো. নুরুন নেওয়াজ সেলিম, কো-চেয়ারম্যান ও সহসভাপতি সৈয়দ জামাল আহমেদ, চেম্বারের যুগ্মসচিব নুরুল আবছার চৌধুরী বক্তব্য দেন। আলোচনা পর্ব শেষে ফিতা কেটে ও বেলুন উড়িয়ে মেলার উদ্বোধন করেন বাণিজ্য মন্ত্রী। এরপর তিনি ইউনিলিভার, হাতিল ও আখতার ফার্নিচারের প্যাভিলিয়ন পরিদর্শন করেন।
উল্লেখ্য, এবার মেলার প্রবেশমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে জনপ্রতি ১০ টাকা।
আইএস, তালেবান, আল কায়েদার স্টাইলে যারা মায়ের বুক খালি করছে তাদের সঙ্গে সংলাপ নয়
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন