দেশি বার্তা - ২৪ ঘন্টা দেশের খবর

মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০১৫

অগ্নিঝরা মার্চ | সকালের খবর



বিশেষ প্রতিনিধি :
দেশমাতৃকাকে হানাদারমুক্ত করতে দৃপ্ত শপথে বলীয়ান পুরো বাঙালি জাতি। একাত্তরের মার্চের এই দিনে স্বাধিকার চেতনায় শাণিত বাঙালি ছিল আন্দোলনমুখর। বাংলাদেশ তখন বিদ্রোহ-বিক্ষোভে টালমাটাল, বীর বাঙালি স্বাধীনতা অর্জনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।  একাত্তরের ৪ মার্চ ছিল দেশজুড়ে লাগাতার হরতালের তৃতীয় দিন। সারাদেশে পূর্বঘোষিত আট ঘণ্টার হরতাল পালিত হয় সর্বাত্মকভাবে। আর ‘রেডিও পাকিস্তান’ পরিণত হয় ‘বাংলাদেশ বেতারে’। বেতার ও টেলিভিশনে হরতালের সমর্থনে দেশাত্মবোধক গান পরিবেশিত হতে থাকে। খুলনা ও রংপুরে কারফিউ বহাল থাকলেও ঢাকায় তুলে নেওয়া হয়। দ্রোহ-ক্ষোভে বঞ্চিত শোষিত বাঙালি তখন ক্রমেই ফুঁসে উঠছিল ঔপনিবেশিক পাকিস্তানি শাসক-শোষকদের বিরুদ্ধে। এক্ষেত্রে বসে নেই কুখ্যাত পাকিস্তানি বাহিনী। তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদররাও বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলন নস্যাত্ করতে তত্পর। কারফিউ দিয়েও সামরিক জান্তারা বীর বাঙালিদের ঘরে আটকে রাখতে না পেরে গোপনে আঁটতে থাকে কতটা নৃশংস ও নিষ্ঠুরভাবে বাঙালি নিধন করা যায় সে পরিকল্পনা। শুধু অপেক্ষা করতে থাকে ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কী বলেন।


আন্দোলনের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা দফায় দফায় বৈঠকে বসেন ৭ মার্চের জনসভা সফল করার জন্য। তত্কালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) চলতে থাকে জনসভার প্রস্তুতি। পাশাপাশি ঢাকাসহ সারাদেশেই গঠন হতে থাকে সংগ্রাম কমিটি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের যুব ও ছাত্র নেতারা গোপনে নানা স্থান থেকে অস্ত্র সংগ্রহ অভিযান চালাতে থাকেন বেশ জোরেশোরেই।


একাত্তরের এই দিনে অর্থাত্ ৪ মার্চ, ১৯৭১ ক্ষুব্ধ বাঙালির মিছিলে মিছিলে ঝাঁঝালো স্লোগানে প্রকম্পিত ছিল সারাদেশ। মূল স্লোগান ছিল ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’, ‘তোমার দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ।’ এদিন খুলনায় হরতাল পালনকালে পাকিস্তানি বাহিনীর হামলায় বহু মানুষ আহত হয়। ঢাকায় গত দুই দিনে গুলিতে আহতদের মধ্যে অনেকের মৃত্যু সংবাদ পাওয়া যায়। দুই দিনে ঢাকায় মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হয় মোট ১২১ জন। যশোরে পাকসেনাদের গুলিতে শহীদ হন মিছিলে অংশগ্রহণকারী চারুবালা ধর।


জনতা তার লাশ নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে এবং প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তোলে। চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি অবাঙালিদের অব্যাহত আক্রমণে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ৩ ও ৪ মার্চ-এ দু’দিনে এখানে ১২০ জন শহীদ এবং ৩৩৫ জন আহত হয়। সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিল, সভা-সমাবেশ ও শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পিলখানা ইপিআর ব্যারাকের বাঙালি জওয়ানরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের মাধ্যমে রাজপথের মিছিলকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। দেশের সর্বত্র বেসামরিক প্রশাসন অচল হয়ে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ ‘দৈনিক পাকিস্তান অবজারভার’ পত্রিকার গণবিরোধী ভূমিকায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক নির্বিচারে মানুষ হত্যার প্রতিবাদে এক গণসমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এমআর সিদ্দিকী স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। ঢাকায় জাতীয় লীগের এক জরুরি সভায় অলি আহাদ অবিলম্বে সামরিক শাসন প্রত্যাহার ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান।


মওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে সাত কোটি বাঙালির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের দাবি জানান।  বঙ্গবন্ধু এক বিবৃতিতে শোষণ ও ঔপনিবেশিক শাসন বজায় রাখার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর আহ্বানে দেশের প্রতিটি মানুষ যে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া দিয়েছে সে জন্য বীর জনতাকে অভিনন্দন জানান। ৪ মার্চ রাত ১১টায় রাও ফরমান আলী বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে তার কাছে কতিপয় প্রস্তাব নিয়ে গেলে বঙ্গবন্ধু তা প্রত্যাখ্যান করেন। তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর এসএম আহসান এদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরকারের চলমান কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করলে তাকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে তার স্থলে লে. জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। টেলিফোন মারফত এ তথ্য জানতে পেরে তিনি এদেশ থেকে বিদায় নেন এবং বিদায় নেওয়ার প্রাক্কালে বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণকে শুভেচ্ছা জানান। অন্যদিকে করাচিতে ভুট্টো এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দেশের সংহতির জন্য তার দল যতদূর সম্ভব হয় ছয় দফার কাছাকাছি যাওয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।


মুসলিম লীগের (কনভেনশন) সাধারণ সম্পাদক এএনএম ইউসুফ ১০ মার্চ সংসদের অধিবেশন ডাকার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার প্রতি আহ্বান জানান। জমিয়তুল উলামা-ই ইসলামের নেতা মাওলানা গোলাম গাউস হাজারভি পিপিপি নেতা ভুট্টোর সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত না থাকার জন্য হুমকির কঠোর সমালোচনা করেন। বেলুচিস্তান ন্যাপ (ওয়ালি) জাতীয় সংসদ অধিবেশন স্থগিত করার প্রতিবাদে সমগ্র বেলুচিস্তানে ১২ মার্চ হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।




অগ্নিঝরা মার্চ | সকালের খবর

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন