ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিন হত্যাচেষ্টা মামলা
ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিন হত্যাচেষ্টার মামলায় সাদ-আল-নাহিনসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। নাহিন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নুর ভাতিজা। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আসিফের ওপর হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন নাহিন।
অভিযোগপত্রভুক্ত অপর নয় আসামির মধ্যে উগ্রপন্থী জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি মুহাম্মদ জসীমউদ্দিন রাহমানীও রয়েছেন। জসীমউদ্দিন ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার হত্যা মামলারও অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি।
২০১৩ সালের ১৪ জানুয়ারি রাতে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরে নিজ কর্মস্থলের সামনে ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিনের ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো হয়। হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। এ ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা হয়। পরে মামলাটি তদন্ত করে ডিবি পুলিশ।
ডিবি সূত্র জানায়, তদন্ত শেষে ডিবির পরিদর্শক নিবারণ চন্দ্র বর্মণ সম্প্রতি আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নাহিন, জসীমউদ্দিনসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করেন। তাঁদের মধ্যে প্রধান আসামি নাহিনসহ জসীমউদ্দিন, কামাল হোসেন সরদার, কাওছার হোসেন ও কামালউদ্দিন কারাগারে আছেন। বাকি পাঁচ আসামি রেদোয়ানুল আজাদ, নবীর ওরফে নবীন, আবদুল করিম, মানিক ও ফাহিম পলাতক রয়েছেন।
নিবারণ চন্দ্র বর্মণ বলেন, পলাতক আসামি করিম, মানিক ও ফাহিমের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা পাওয়া গেলে সম্পূরক অভিযোগপত্রে তা উল্লেখ করা হবে।
অভিযোগ রয়েছে, নাহিনকে এই মামলা থেকে বাঁচাতে তদবির ও পুলিশের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। চাপের কারণে বাদীকে চিকিৎসা সনদ পেতেও বেগ পেতে হয়েছিল।
এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক গত রোববার প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা আমি জানি না।’ ভাতিজা নাহিন কীভাবে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সঙ্গে জড়ালেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ও তো বাচ্চা ছেলে, পড়ালেখা করে। হয়তো পোলাপানের সঙ্গে মিশে এই রকম হলো কি না।’
মামলার তদন্ত-তদারক কর্মকর্তা ডিবির উপকমিশনার শেখ নাজমুল আলম জানান, আদালত ইতিমধ্যে অভিযোগপত্র গ্রহণ করে আগামী ৪ এপ্রিল শুনানির দিন ধার্য করেছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গুপ্তচর নিয়োগ, তথ্যপ্রযুক্তি ও বাদীর সহায়তা নিয়ে আসামিদের শনাক্ত করে ২০১৩ সালের ৩১ মার্চ নাহিনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে এই মামলায় জসীমউদ্দিন রাহমানীকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। নাহিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগে এমবিএ পড়তেন। তাঁর বাবা নজরুল হক রাজধানীর একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং কিশোরগঞ্জের একটি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ও আদালত সূত্র জানায়, ব্লগার আসিফ হত্যাচেষ্টার মামলায় গ্রেপ্তারের পর সাদ-আল-নাহিন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, তিনি মুফতি জসীমউদ্দিন রাহমানীর খুতবায় ও বয়ানে অংশ নিতেন। জসীমউদ্দিন খুতবা ও বয়ানে মহানবী (সা.) ও ধর্মকে অবমাননাকারী ব্লগারদের কতল বা খুন করতে উৎসাহিত করেন। জসীমউদ্দিনের বয়ানে উদ্বুদ্ধ ও প্ররোচিত হয়ে তিনি সহযোগীদের নিয়ে ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিনকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন। এ জন্য তিনি ছুরি ও চাপাতি কেনেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি ও তাঁর পাঁচ সহযোগী ধারালো অস্ত্র নিয়ে আসিফ মহিউদ্দিনকে হত্যার জন্য হামলা করেন। কিন্তু আসিফ বেঁচে যান। পরে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আসিফের ঘনিষ্ঠজন পরিচয়ে তাঁর ওয়ার্ড ও বিছানা চিনে আসেন। চিকিৎসকের অ্যাপ্রোন পরে ইনজেকশন প্রয়োগে তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করলেও তিনি সফল হতে পারেননি।
অবশ্য নাহিনের বাবা দাবি করেন, ভয় দেখিয়ে নাহিনকে জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেছে পুলিশ। নাহিন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সঙ্গে যুক্ত নন।
ব্লগার আসিফের ওপর হামলার এক মাস পর ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে পল্লবীতে নিজ বাড়ির সামনে একই কায়দায় চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে খুন করা হয় ব্লগার রাজীব হায়দারকে। এ মামলায় জসীমউদ্দিনসহ আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। আসামিদের একজন রেদোয়ানুল আজাদ রানা পলাতক। অন্যরা কারাগারে। আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন শেষে মামলাটি এখন মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন।
এদিকে বহুমাত্রিক লেখক অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ হত্যা মামলাটিও আদালতে বিচারাধীন। ইতিমধ্যে কয়েকজনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে অমর একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে টিএসসির কাছে হুমায়ুন আজাদকে কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা। এ মামলায় অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন জেএমবির শুহরা সদস্য মিজানুর রহমান, আনোয়ার আলম, নূর মোহাম্মদ (পলাতক) ও সালাহউদ্দিন (পলাতক)।
১০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন