রিচমন্ড পাহাড়ের চূড়ায় জোট বেঁধেছে কালো মেঘের দল। নেলসনের অধিবাসীরা ওখানে চোখ রেখেই নাকি পড়ে নিতে পারে আকাশের মন। এখানকার রেডিওতেও বলছিল তা। ম্যাচের দিন মেঘলা থাকবে আকাশ। স্যাক্সটন ওভালের যে দিকটায় পাহাড়ের গায়ে হেলেছে মেঘ, সেদিকটায় একবার তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন অন্য পাশের তাসমান পাড়ে। সেখানে অনিশ্চয়তার মেঘ নয়, অনিন্দ্যসুন্দর সূর্য খুঁজে পেয়েছিলেন মাশরাফি বিন মর্তুজা_ ‘পাহাড়ের দিকে নয়, সমুদ্রের দিকে দেখুন, ওখানে চকচক করছে রোদ্দুর …।’ বিশ্বকাপের যে সূর্য মেলবোর্নে ঢাকা পড়েছিল হতাশার অন্ধকার মেঘে, নেলসনে সেটা থেকেই ফের জ্যোতি ফিরে পেতে চান মাশরাফিরা। আজ দিন শেষে ভোরে এই মাঠে যখন স্কটল্যান্ডের সঙ্গে খেলতে নামবেন তারা; বাংলাদেশে তখন ভোর রাতের আড়মোড়ানি। রিচমন্ডের মেঘ-রোদ্দুরের খেলা নয়, ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে তারা সাকিব-তামিমদের চার-ছক্কার রোমাঞ্চ উপভোগ করতে চায়। টেনশন ফ্রি নিশ্চিত একটি জয় দেখতে চায়। যেটা আশা করা দোষের কিছু নয়।
ধারে এবং ভারে সব দিক থেকেই স্কটল্যান্ডের সঙ্গের এ ম্যাচে ফেভারিট বাংলাদেশ। তবে স্যাক্সটন ওভাল ফেভারিটদের জন্য ভয়ঙ্কর একটি নাম। ক’দিন আগেই এই মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়েছিল আয়ারল্যান্ড। সেদিনের পর আইরিশ অধিনায়কের দেওয়া একটি অটোগ্রাফও রেখে দিয়েছেন কিউরেটর। মোটা গোঁফে হাত বুলিয়ে সেটা দেখিয়েই কিউরেটর বলছিলেন, ফেভারিটরা সাবধান! ভয় দেখাচ্ছেন আরও অনেকে। শেন জার্গেনসেনকে ক’দিনের জন্য ফিজি থেকে আনা হয়েছে শুধু সাকিবদের ইনফরমেশন ফাইলগুলো ওপেন করতে। তবে কবে, কার উঠোন ভেঙেছে সেটা নিয়ে ভাবার সময় নেই বাংলাদেশ দলের_ ‘এখনকার সময়ে তথ্য জানার জন্য অনেক উপায় আছে। টেলিভিশন, ভিডিওতে কারও খেলা দেখেই বিশ্লেষণ করা যায়।’ প্রতিপক্ষ শিবিরে গোয়েন্দার উপস্থিতি টের পেয়েও যেন গা লাগালেন না সাকিব। আসলে এ মুহূর্তে পয়েন্টের যে হিসাব-নিকাশ তাতে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য ‘মযার্দা’র লড়াই। ম্যাচটি জিতলে যেমন, হারলেও তেমন কোয়ার্টারে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে মাশরাফিদের জন্য। স্কটিশদের হারিয়ে মনের সে জোরটাই আরও দীপ্ত করতে চান মাশরাফিরা, যেটা দিয়ে পরের ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লড়াই করা যাবে। ‘সত্যি কথা বলতে কী এই ম্যাচটি আমাদের কাছে দু’দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, ম্যাচটি জিতলে দুটি পয়েন্ট পাওয়া যাবে। তবে কোয়ার্টারে যেতে হলে অবশ্যই ইংল্যান্ডকে হারাতে হবে। আর ইংল্যান্ডকে হারানোর জন্য যে আত্মবিশ্বাস, সেটা স্কটল্যান্ডের এই ম্যাচ থেকেই নিতে হবে।’ সোজাসাপ্টা কথায় ম্যাচের মূল্যমান বুঝিয়ে দিলেন অধিনায়ক।
টিম মিটিংয়েও ঠিক হয়েছে মেলবোর্নে যেসব ভুল হয়েছে তা শুধরে নেওয়ার মঞ্চ এই নেলসন_ যারা সেদিন খারাপ করেছিলে, আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলে, তারা যে যত পারো স্কটিশদের সঙ্গে ভালো খেলে তৈরি থাক ইংলিশদের বিপক্ষে চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য। কোচ এবং অধিনায়কের মন বুঝতে পেরে এনামুল-তাসকিনরা গতকাল অনেকক্ষণ ক্যাচ প্র্যাকটিস করলেন। সেন্টার উইকেটে তামিমও অনেকক্ষণ চার-ছক্কায় হাত খুললেন। এমনিতে ছোট মাঠ হওয়ায় বাউন্ডারি হবে বেশি, তার ওপর পিচেও ঘাসের কোনো ডগা নেই, যা দেখে স্কটল্যান্ডের ব্যাটিং পরামর্শক পল কলিংউড মাশরাফিকে বলেই দিয়েছেন, এই মাঠে ২৮০ রান না করলে জেতার চিন্তা করো না। কিন্তু তিনশ’র কাছাকাছি রান করতে হলে তো টপ অর্ডারের কাউকেই আগে হাত তুলতে হবে। কে সে? তামিম না এনামুল? প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে খুব বেশি আত্মবিশ্বাসী দেখাল না অধিনায়ককে_ ‘তামিম কিংবা এনামুলের কেউ যদি বড় ইনিংস খেলে ফেলে, তাহলে আমাদের মিডল আর লোয়ার অর্ডার মিলে অবশ্যই তিনশ’র কাছাকাছি নিতে পারবে। কিন্তু গত কিছু ম্যাচে সেটা হচ্ছে কোথায় …।’
শেয়ারবাজারের মতো বাংলাদেশের পারফরম্যান্সের এই উত্থান-পতনকে দারুণভাবে মার্ক করেছে স্কটল্যান্ড। মাত্র এই ম্যাচের জন্য তারা ফিজি থেকে উড়িয়ে এনেছেন শেন জার্গেনসেনকে। ব্যাটিং কোচ হিসেবে ঠিক করেছে পল কলিংউডকে। বাংলাদেশের বাঁহাতি ব্যাটসম্যানদের জন্য বিশেষ কিছু পরিকল্পনাও তৈরি করেছেন তাদের কোচ। কিন্তু বাংলাদেশি স্পিন মোকাবেলার জন্য জুতসই কিছু খুঁজে পায়নি স্কটিশরা। ‘আমরা জানি বাংলাদেশের শক্তি তাদের স্পিনে। যেটাতে আমরা খুব একটা অভ্যস্ত নই। তবে এখানকার কন্ডিশনে স্পিনাররা খুব বেশি সুবিধা করতে পারবে না। আমাদের ব্যাটসম্যানরা তৈরি বাংলাদেশের সব বোলারকে মোকাবেলা করার’_ স্কটিশ অধিনায়ক প্রিসটন মমসেন প্র্যাকটিস শেষে বলছিলেন। নিউজিল্যান্ডের কন্ডিশনকে তিনি ভীষণভাবে কাজে লাগাতে চাইছেন। এবারের বিশ্বকাপে একটি জয়ও পায়নি তারা। আফগানিস্তানের সঙ্গে লড়াই হয়েছে, নিউজিল্যান্ডকেও শুরুতে কিছুটা ধাক্কা দিতে পেরেছে; কিন্তু জয় এখনও শূন্য_ ‘আমরা এখনও আইসিসির পূর্ণ সদস্য কোনো দেশকে ওয়ানডেতে হারাতে পারিনি। সুতরাং বাংলাদেশের সঙ্গে এই ম্যাচটি আমাদের জন্য দারুণ একটি সুযোগ।’ দুই দলের তিনটি ওয়ানডে খেলার ইতিহাস আছে। যার তিনটিতেই জয় বাংলাদেশের। তবে সেগুলো এত পুরনো যে, তার চেয়ে কাছাকাছি টি২০ ম্যাচটি আনতে চান স্কটিশ অধিনায়ক_ ‘২০১২ সালে নেদারল্যান্ডসে আমরা বাংলাদেশকে হারিয়েছিলাম। ভাবতে ভালো লাগে সেই ম্যাচে আমি নিজেও ছিলাম। তবে এখন ওয়ানডে খেলতে নামছি। আমাদের দলেও অনেক পরিবর্তন আছে। আশা করছি, দারুণ একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ম্যাচ দেখাতে পারব।’
দামি সানগ্গ্নাসের ভেতর থেকেও স্কটিশ অধিনায়কের স্ব্বপি্নল চোখ দুটি দেখা যাচ্ছিল। বোঝা যাচ্ছিল একটি টেস্টখেলুড়ে দেশকে হারানোর ইচ্ছেটা কত প্রবল তাদের। এ নেলসনেই আইরিশরা রূপকথা লিখেছে, স্কটিশরাও চাইছে তেমনই এক উপাখ্যান তৈরি করতে। বাংলাদেশও চাইছে কোয়ার্টার ফাইনালের যাত্রাপথে এই নেলসন থেকেই প্রয়োজনীয় রসদ তুলে নিতে। তাই নেলসন হয়ে উঠেছে দু’দলের কাছেই আশার মঞ্চ।
আত্মবিশ্বাস খুঁজে পাওয়ার ম্যাচ |
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন