‘এদেশের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার সর্বনাশ করলো কে?’ শিরোনামে মুহম্মদ জাফর ইকবাল প্রধানত দায়ী করলেন গাইডবই ব্যবসায়ীদের। তাদের লোভের বলি হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা, ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থা, এমনকি নোট বই বন্ধ করার জন্য যে সৃজনশীল পদ্ধতি আবিষ্কার করা হলো, সেটাকেও মুক্ত করা গেলো না এই থাবা থেকে, মোটামুটি এই হলো তার সিদ্ধান্তসমূহ।
শুধু লোভ! বিজ্ঞানীদের এই কারণেই সমাজবিজ্ঞান সম্পর্কেও কিছু ধারণা থাকা দরকার। লোভেরও ব্যকরণ আছে, নিয়ম-কানুনের উর্ধে সে নয়। সমাজধ্বংসী লোভের উৎপত্তি খোঁজা সম্ভব, তার নিরাময়ও সর্বাংশে না হলেও গ্রহণযোগ্যমাত্রায় নামিয়ে আনাও কঠিন না। নোটবই-গাইড বইয়ের চাহিদা কেন তৈরি হলো, এত এত আইন তৈরি করেও কেন এগুলো বন্ধ করা গেলো না, সে বিষয়ে লেখক কি কিছু ভেবেছেন? কিছু প্রাথমিক ভাবনার রসদ দেয়া যাক:
১. কোন একটা পণ্য কেন বাজারে চালু থাকে? চাহিদা আছে বলেই। বিদ্যালয়ে যথাযথ শিক্ষা দেয়া হলে গাইড বই ধরার কি দরকার পড়তো শিক্ষার্থীদের?
২. তো শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে কেন যথাযথ শিক্ষা পান না? সম্ভবত তিনটে প্রধান কারণ আছে। এক, শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে পড়ান না, বাড়িতে আসতে বলেন। দুই, শিক্ষকরা যোগ্য নন। তিন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ভয়াবহ রকমের বেশি।
শিক্ষকরা বাড়িতে পড়তে আসতে বলেন কেন? আইন করে কি তা বন্ধ করা যাবে? কখনো যাবে না, যতক্ষণ না আইন মেনে মোটামুটি সম্মানজনক জীবিকা তারা তারা অর্জন করতে পারছেন। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচে বড় সর্বনাশ যদি কেউ করে থাকে, সেটা সকল শিক্ষামন্ত্রী কিংবা অর্থমন্ত্রীরা, যারা শিক্ষকদের জন্য এমন বেতন নির্ধারণ করে আসছেন যুগ যুগ ধরে যে কোন যোগ্য ছেলে-মেয়ে শিক্ষক হবার কথা ভাবতে পারে না। যদি কেউ তা হনও, আর্থিক চাপে তাদের অধিকাংশের নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। তারা আত্মসমর্পণ করেন। যতদিন না এমন বেতন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের জন্যও নির্ধারিত না হবে যে সবচে যোগ্য ছেলেমেয়েরা শিক্ষকতায় আসছেন, ততক্ষণ শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির কথা কল্পনাই করা যাবে না।
আর্থিক দুরাবস্থার স্বাভাবিক ফলাফল হলো খুব সম্ভবত দেশের অধিকাংশ শিক্ষক শিক্ষা প্রদানের উপযুক্তই নন। মফস্বলে যাওয়া আসা আছে, এমনকি শহরের বিদ্যালয়গুলোতেও, শিক্ষকদের মানের ভয়াবহতা না খেয়াল করে পারবেন না। এমনকি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এখন অনুদান নিয়ে যেমন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়, তেমনি অনুদান নিয়ে বাড়ির বসে থাকা সদস্যদের, পুত্র, মেয়ের জামাই, পুত্রবধু ইত্যাদিকে শিক্ষকতা পেশা জুটিয়ে দেয়ার ভয়ানক এক প্রবণতা শুরু হয়েছে মফস্বলে। এই শিক্ষকরা কি করে ব্যকরণ বা গণিত, রসায়ন বা পদার্থবিদ্যা বোঝাবেন? কি করে ভুগোল বা ইতিহাসে আগ্রহী করবেন শিক্ষার্থীদের?
শিক্ষার্থী শিক্ষক অনুপাতটাও পড়াবার অনুকূল নয় বহুক্ষেত্রে। অবশ্য জনপ্রিয় শিক্ষকদের ব্যক্তিগত পাঠদানেও ব্যবসাতেও দেখা যাবে চল্লিশ পঞ্চাশ জন উপস্থিত!
৩. তাহলে যে ব্যবস্থায় আপনি প্রায় সকল শিক্ষার্থীকে ধরেবেধে এমন দশার মাঝে ফেললেন যেখানে মুখস্ত করাই একমাত্র উপায়, সেখানে নোটবই গাইড বইয়ের রমরমা খুবই সঙ্গত এবং স্বাভাবিক। এখানে নানান নিয়মকানুন জারি করা কিংবা এই ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কামান দাগানো সামান্যই উপকারে আসবে।
৪. আরও ছোটখাট কিছু বিষয়। অধিকাংশ বিদ্যালয়ে কোন খাবার দেয়া হয় না শিক্ষার্থীদের। শিক্ষার্থীদের বিষয় বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি খিদে পেটে কোন পড়া তার বুদ্ধিতে কুলোয় না, অতএব মুখস্তই অবলম্বন হয়। ঢোকে না। হয়তো এই কারণেই সভ্য দেশগুলোতে বাচ্চাদের খাবারের বন্দোবস্ত করা হয়।
৫. খুব সম্ভবত আমাদের বিদ্যালয়ে ছেলেমেয়েদের দৈনিক কাটানো সময়ের পরিমানও বাড়ানো দরকার। তার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য বিরতি এবং খেলাধূলার ব্যবস্থা করা দরকার। একই বিদ্যালয়ে সকাল বিকাল দুই দফায় দুই দল শিক্ষার্থীকে পড়ানো সম্পদের সীমাবদ্ধতার অজুহাতে করে আসা হচ্ছে। সম্পদ আমাদের কম নেই, দরকার সেগুলোকে লুটের মাল বানানো বন্ধ করা।
৬. মধ্যবিত্ত -উচ্চবিত্ত তার সন্তানদের বাড়িতে পড়াবার জন্য মাসে পাঁচ থেকে বিশ হাজার পর্যন্ত অনায়াসে খরচ করছেন। দরিদ্র মানুষও এক দুই হাজার টাকা নাভিঃশ্বাস তুলে খরচ করতে বাধ্য হচ্ছেন। কেন আমরা শিক্ষার উন্নয়নের জন্য স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চআয়ের মানুষের ওপর শিক্ষাকর বসিয়ে সকলের জন্য একই পদ্ধতির এমন শিক্ষার ব্যবস্থা করছি না যেটা সারা দেশে একই মানের যোগ্য শিক্ষকদের তুলে দেবে শিক্ষার্থীদের সামনে?
পাঠশালাটাকেই এমন বানিয়ে ফেলার প্রস্তাব করুন না, চারদিকের বিপুল চুরিদারির টাকাগুলো শিক্ষায় বরাদ্দ করতে বাধ্য করে এমন আওয়াজ তুলুন না যেখানে নোটবই গাইড বইয়ের চাহিদাটাই উধাও হয়ে যাবে! এমন শিক্ষানীতি নিন যেন বিদ্যালয়গুলোই এমন হয় যেখানে ছেলেটা-মেয়েটা খেলাধূলা করবে, একটা নাশতা আর একটা ভারি খাবার খাবে, আর পড়াশোনার আগাপাশতলা সেখানেই শেষ করে বাড়িতে এসে বাবা-মার সাথে জেগে থাকার বাকি সময়টুকু হেসেখেলে কাটাবে।
- ফিরোজ আহমেদ, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন
লোভেরও ব্যকরণ আছে
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন