দেশি বার্তা - ২৪ ঘন্টা দেশের খবর

মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০১৫

দৃষ্টি আজ আদালতে | | Samakal Online Version


টানা অবরোধ ও হরতালের মধ্যেই সবার দৃষ্টি আজ আদালতের দিকে। ঢাকার বকশীবাজার আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী আদালত থেকে কী সিদ্ধান্ত আসবে_ তা দেখার অপেক্ষায় দেশবাসী। ওই আদালতে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির দুই মামলায় জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানা প্রত্যাহারের (রিকল) জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আবেদনের শুনানি হবে। খালেদা জিয়ার পক্ষে গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার তৃতীয় বিশেষ আদালতে পরোয়ানা প্রত্যাহারের আবেদন করলে শুনানির জন্য এ দিন ধার্য করা হয়। এ পরিস্থিতিতে আজ খালেদা জিয়া কি আদালতে হাজির হবেন? আদালত কি তার পরোয়ানা প্রত্যাহার করবেন? অথবা হাজির হতে তাকে সর্বশেষ সময় বেঁধে দেবেন? নাকি পরোয়ানা বহাল থাকবে এবং খালেদা জিয়া গ্রেফতার হবেন? গতকাল মঙ্গলবার দেশজুড়ে জনমনে এসব প্রশ্ন ঘুরপাক খেয়েছে। অবশ্য আজ খালেদা জিয়ার আদালতে হাজিরা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে বলেও জানিয়েছে কয়েকটি সূত্র। সে ক্ষেত্রে তার পক্ষে আদালতে অসুস্থতার সার্টিফিকেট উপস্থাপন করা হতে পারে। তবে অপর একটি সূত্র বলছে, শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়া আজ আদালতে হাজির হলেও হতে পারেন।দৃষ্টি আজ আদালতেস্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা এখনও পুলিশের হাতে পেঁৗছায়নি। পরোয়ানা হাতে পাওয়ার পর আদালতের আদেশ মানতে তারা বাধ্য। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন সাংবাদিকদের বলেছেন, খালেদা জিয়া পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও গুলশান কার্যালয়ে ফেরার নিশ্চয়তা পেলে আদালতে যাবেন।ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার ও ডিএমপির মুখপাত্র মনিরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, আদালতে হাজির হওয়ার সময় খালেদা জিয়াকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেওয়া হবে। তবে খালেদা জিয়ার অপর আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া গতরাতে সমকালকে বলেছেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় খালেদা জিয়ার আদালতে যাওয়া না-যাওয়ার বিষয়টি এখনও নিশ্চিত নয়। দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল গতকাল রাতে সমকালকে বলেন, খালেদা জিয়া যদি আদালতে না যান, সে ক্ষেত্রে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।


এ পরিস্থিতির মধ্যেই গতকাল সন্ধ্যায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে আকস্মিক সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেনস বার্নিকাটসহ ১৬ কূটনীতিক। চলমান সংকটের মধ্যে খালেদা জিয়ার সঙ্গে কূটনীতিকদের আকস্মিক সাক্ষাতের খবর মানুষের আগ্রহে নতুন মাত্রা যোগ করে। বৈঠক শেষে কূটনীতিকদের পক্ষে অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার গ্রেগ উইলকক সাংবাদিকদের বলেছেন, সহিংসতা বন্ধ ও গণতন্ত্র অব্যাহত থাকার ব্যাপারে তারা আশাবাদী।এদিকে আজ খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর চেহলামের আয়োজন করা হয়েছে।


সরকারি সূত্র জানায়, সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা দফায় দফায় নিজেদের মধ্যে কথা বলেছেন। কারও কারও সঙ্গে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গেও কথা হয়েছে। দলের নীতিনির্ধারক নেতারা কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে। প্রধানমন্ত্রী সার্বিক বিষয়ে সতর্ক থাকার জন্য নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন।টানা দুই মাস গুলশান কার্যালয়ে অবস্থানরত খালেদার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির বিষয়টি বেশ আলোচিত। সর্বশেষ রোববার একটি মামলায় খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয় তল্লাশির (সার্চ ওয়ারেন্ট) অনুমতি পেয়েছে পুলিশ। কিন্তু আদালতের আদেশ কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ গতকাল এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এ ছাড়া খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ২৫ ফেব্রুয়ারি জারি হওয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা সংশ্লিষ্ট আদালত থেকে এখন পর্যন্ত গুলশান থানায় পেঁৗছেনি।


পরপর তিনটি ধার্য দিবসে হাজির না হওয়ায় একই আদালত ২৫ ফেব্রুয়ারি পৃথক দুটি দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। আসামিরা উপস্থিত না থাকায় প্রথম সাক্ষীর জেরা বাতিল করে পরবর্তী সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণের জন্য ৪ মার্চ দিন ধার্য রাখা হয়। এরই মধ্যে গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা প্রত্যাহারের আবেদন করেন সানাউল্লাহ মিয়া। দুপুর আড়াইটার দিকে ঢাকা জজ আদালতে বিচারকের খাস কামরায় তিনি হাজির হলে বুধবার শুনানির জন্য দিন ধার্য করা হয়। বিচারক আবু আহমেদ জমাদার বলেন, ‘সরকার গেজেট জারি করে এ মামলা পরিচালনার জন্য বকশীবাজারে স্থাপিত অস্থায়ী আদালতকে নির্ধারণ করে দিয়েছেন, এ মামলার কোনো বিষয়েই ওই স্থানের বাইরে তিনি শুনতে কিংবা সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না। এ বিষয়ে আগামী ধার্য তারিখে (আজ বুধবার) নির্ধারিত স্থানেই শুনানি গ্রহণ করা হবে।’এদিকে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির দুই মামলায় নিম্ন আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা স্থগিত চেয়ে গতকাল বিকেলে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় সম্পূরক আবেদন করা হয়েছে। এর পর আবেদনের ওই কপি রাষ্ট্রপক্ষের কাছে পেঁৗছে দেওয়া হয়। খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন সাংবাদিকদের বলেন, সম্পূরক আবেদনে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার আদালত পরিবর্তনের জন্য আবেদন করা হয়েছে। এ ছাড়া দুই মামলার কার্যক্রম স্থগিতের বিষয়ে রুল জারি এবং আবেদনটি হাইকোর্টে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে নিম্ন আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা স্থগিতের জন্যও বলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে শুনানি হতে পারে।স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল বলেছেন, আদেশে যা বলা থাকবে সেভাবেই আমরা ব্যবস্থা নেব। এক প্রশ্নের জবাবে নিজের কার্যালয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, উনি যেহেতু সাবেক প্রধানমন্ত্রী, সেজন্য যেটুকু সম্মান দেখানো দরকার তা করা হবে।খালেদার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, বেগম খালেদা জিয়া আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তার বিরুদ্ধে আদালতের ওয়ারেন্টের কপি এখনও পাইনি, তার পরও যদি তাকে আদালতে যেতে এবং আত্মসমর্পণ করতে হয়, তাহলে তিনি (খালেদা জিয়া) আদালতে যেতে ইচ্ছুক। গতকাল সুপ্রিম কোর্ট বার ভবনে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।


খালেদা জিয়ার অপর আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার (বুধবার) আদালতে যাওয়ার নিরাপত্তা নেই। আমরা গ্রেফতারি পরোয়ানা প্রত্যাহারের আবেদন করেছি। তিনি বলেন, যেহেতু সরকার গেজেটের মাধ্যমে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের বিশেষ অস্থায়ী আদালতে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুটি মামলার বিচারের ব্যবস্থা করেছে, তাই ওই আদালতেই এ আবেদনের শুনানি হবে। তিনি আরও বলেন, বেগম জিয়া আদালতে আসবেন কি-না এ ব্যাপারে তার সঙ্গে আমাদের কোনো কথা হয়নি। সেখানে যেতে আমাদের কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি।সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানিয়েছেন, প্রচলিত নিয়মে খালেদা জিয়াকে সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করেই জামিন চাইতে হবে। এর পর জামিন নামঞ্জুর হলে তিনি উচ্চ আদালতে যেতে পারেন। তবে তার সরাসরি উচ্চ আদালতে জামিন চাওয়ার সুযোগ নেই।


অবশ্য নিরাপত্তা ও গুলশান কার্যালয়ে ফিরতে না দেওয়ার আশঙ্কা থেকে আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নেননি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। দুই মামলায় হাজিরা দিতে খালেদা জিয়া বুধবার আদালতে যাবেন কি-না_ জবাবে তার প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সাংবাদিকদের বলেন, বেগম জিয়া সবসময় আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এ বিষয়ে তিনি এখনও কোনো সিদ্ধান্ত আমাদের জানাননি। আইনজীবীরা বিষয়টি দেখছেন। তবে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি আইনজীবীরা।এদিকে খালেদা জিয়া গ্রেফতারের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে আছেন বলেও জানিয়েছেন তার সঙ্গে থাকা নেতা ও কর্মকর্তারা। তাকে গ্রেফতার করা হলে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়ার চিন্তাভাবনা রয়েছে খালেদা জিয়ার। এ অবস্থায় লন্ডনে অবস্থানরত দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান দল পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবেন বলে খালেদা জিয়া নেতাদের জানিয়ে দিয়েছেন। সিনিয়র নেতাদের একটি সমন্বয় কমিটি তাকে সহযোগিতা করবে। গ্রেফতার হওয়ার পরেও যাতে আন্দোলন অব্যাহত থাকে সে আহ্বান জানিয়ে একটি বিবৃতিও প্রস্তুত করেছেন খালেদা জিয়া।


গুলশান কার্যালয়ে অবস্থানরত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান সমকালকে বলেন, একজন রাজনীতিক হিসেবে চেয়ারপারসন গ্রেফতারবরণে সব সময়ই প্রস্তুত। তবে তাকে গ্রেফতারের আগে সরকার এর ‘ভয়াবহ পরিণতি’ সম্পর্কে ভাববে বলে আশা করি। সুবিবেচকের পরিচয় দিয়ে চেয়ারপারসনকে গ্রেফতার থেকে সরকার বিরত থাকবে বলেই আমি বিশ্বাস করি।


পুলিশের ব্যাপক প্রস্তুতি :খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ও তার কার্যালয়ে তল্লাশির জন্য সার্চ ওয়ারেন্ট জারির পর নানা গুঞ্জন চলছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার ও ডিএমপির মুখপাত্র মনিরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, আদালতে হাজির হওয়ার সময় খালেদা জিয়াকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেওয়া হবে। শুধু খালেদা জিয়া কেন, রাষ্ট্রের যে কোনো নাগরিক পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চাইতে পারে।বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে তল্লাশি করতে আদালতের ‘সার্চ ওয়ারেন্ট’ থানায় পেঁৗছলেও তা কার্যকরে এখনও উদ্যোগ নেয়নি পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয়ে তল্লাশির ব্যাপারে কোনো আলামত দেখা যায়নি। খালেদা জিয়া আদালতে হাজির হতে পারেন_ এমন কিছু আলামতের আঁচ পেয়ে হয়তো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছুটা ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করছে বলে দায়িত্বশীল এক পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তাই সার্চ ওয়ারেন্ট হাতে পাওয়ার পরও তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।


তবে অনেকের ধারণা, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয়ে তল্লাশি চালিয়ে সেখানে থাকা বিএনপির কয়েকজন নেতাকে যে কোনো সময় আটক করা হতে পারে। এ ছাড়া খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে থাকা কম্পিউটার বা অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ তল্লাশি করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সবকিছু নির্ভর করছে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।খালেদা জিয়া এই দুই মামলায় সর্বশেষ গত ২৪ ডিসেম্বর হাজিরা দিয়েছিলেন পুরান ঢাকার বকশীবাজারে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত আদালতের বিশেষ এজলাসে। ওই দিন তার হাজিরাকে কেন্দ্র করে ওই এলাকায় ব্যাপক হট্টগোল হয়েছিল। বিএনপি কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘাতের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি ছবি বিশ্বাসের ওপর হামলা করা হয়েছিল।




দৃষ্টি আজ আদালতে | | Samakal Online Version

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন