রাজশাহী অফিস :
রাজশাহী পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল গফুরকে হত্যার পর ঢাকার আজিমপুর গোরস্তানে দাফন করা হয়েছিল। এ ঘটনায় মেয়রের কথিত প্রেমিকা জান্নাতুন সালমা মীমের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে তাকে নিয়ে গতকাল দুপুরে পবা থানা পুলিশের একটি দল আজিমপুর গোরস্তানে পৌঁছায়। বিকেলে তার লাশ উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পবা থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আবুল কালাম আজাদ জানান, আজিমপুর গোরস্তানের রেজিস্ট্রি খাতায় মেয়র গফুরের মৃত্যু ৩ জানুয়ারি ও দাফন ৬ জানুয়ারি উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয় দফা রিমান্ডে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জান্নাতুন সালমা মীম মেয়র আবদুল গফুরকে হত্যা করার কথা স্বীকার করেন।
পুলিশ পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ জানান, প্রথম দফায় চার দিনের রিমান্ড শেষে গত ১ মার্চ স্বীকারোক্তি দিতে চেয়েও মীম আদালতে মেয়র গফুরকে হত্যা করার স্বীকারোক্তি দিতে রাজি হননি। ফলে ওইদিন তাকে আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরও সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। দ্বিতীয় দফা রিমান্ডে তার দেওয়া তথ্যানুযায়ী গতকাল সকালে তাকে নিয়ে পবা থানা পুলিশ ঢাকায় যায়। দুপুরে আজিমপুর গোরস্তানে মীমকে নিয়ে উপস্থিত হলে গোরস্তানের কেয়ারটেকার মেয়র গফুরকে দাফনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
আজিমপুর গোরস্তান এলাকার ইমাম হাফিজুল ইসলাম পুলিশকে জানান, মীম তাদেরকে বলেছিলেন ৩ জানুয়ারি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তার ভাই আবদুল গফুর মারা গেছেন। দাফনের আগ পর্যন্ত লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে রাখা ছিল। এ ব্যাপারে হাসপাতালের একটি মৃত্যু সনদও দেখান তিনি। পরে ৬ জানুয়ারি আজিমপুর গোরস্তানে লাশ দাফন করা হয়। তবে ওই মৃত্যু সনদ পুলিশকে দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন মীম। পুলিশের ধারণা, মেয়র গফুরকে হত্যার পর হাসপাতালের ভুয়া মৃত্যু সনদ দেখিয়ে কৌশলে স্বাভাবিক মৃত্যু বলে লাশ দাফন করা হয়েছে।
পুলিশ পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে আজ বুধবার তারা লাশ নিয়ে রাজশাহী ফিরবেন। এরপর হত্যার রহস্য মিডিয়াকে জানাবেন।
পবা থানার ওসি মতিয়ার রহমান জানান, জান্নাতুন সালমা মীমের বাবার বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায়। তার বিয়ে হয়েছে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া গ্রামের এমাজ উদ্দিনের ছেলে হারুন অর রশিদের সঙ্গে। হারুন ঢাকায় একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে চাকরি করেন। কয়েক বছর আগে তিনি নওহাটায় সায়াগ্রাম নামে একটি এনজিও প্রতিষ্ঠা করেন।
ওই এনজিওর নামে একটি ক্লিনিক খুলে নিজেকে এমবিবিএস চিকিত্সক দাবি করে চিকিত্সা কার্যক্রম চালাচ্ছিলেন হারুন ও মীম। দুই বছর আগে ওই এনজিও এবং ক্লিনিকটি তারা গুটিয়ে নেন। এরপর নওগাঁ গিয়ে সালমা ক্লিনিক নামে একটি ক্লিনিক খোলেন তারা। মীম ও তার বোন জান্নাতুন নাইম ওই ক্লিনিক দেখাশোনা করতেন। ওসি জানান, জান্নাতুন সালমা মীম নওহাটায় ক্লিনিক পরিচালনার সময় নিজেকে চিকিত্সক পরিচয় দিয়ে নওহাটা পৌর মেয়র আবদুল গফুরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। নওহাটা পৌর মেয়র আবদুল গফুরের স্ত্রী ফজিলাতুন্নেসা পারুল জানান, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন মেয়র। গত ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত পরিবার ও নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে মোবাইলের মাধ্যমে মেয়রের যোগাযোগ ছিল। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ হন।
পবা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবুল কালাম আজাদ বলেন, ৬ জানুয়ারি থেকে বন্ধ থাকার পর ১৬ ও ১৭ জানুয়ারি মেয়রের দুটি মোবাইল ফোন নম্বর থেকে তার ছেলের মোবাইলে দুটি এসএমএস আসে। ওই দুটি এসএমএসের একটিতে ২৫ হাজার টাকা এবং অন্যটিতে ৫০ হাজার টাকা বিকাশের মাধ্যমে পাঠাতে বলা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন যোগাযোগ বিছিন্ন থাকার পর এসএমএস করে বিকাশে টাকা চাওয়ার বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ হলে ১৯ জানুয়ারি মেয়রের স্ত্রী ফজিলাতুন্নেসা পারুল পবা থানায় অপহরণ মামলা দায়ের করেন। তখন পুলিশ তদন্তে নামে। পবা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবুল কালাম আজাদ চাঞ্চল্যকর এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিযুক্ত হন। তিনি বলেন, মোবাইল ফোন ট্র্যাক করে মেয়রের ফোন নাম্বারের অবস্থান ৭ জানুয়ারি নওগাঁ এবং তারপর থেকে ঢাকায় পাওয়া যায়। মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে গত ২৩ জানুয়ারি ঢাকার সংসদ ভবন এলাকা থেকে মীমকে আটক করা হয়। আটকের পর মীম নিজেকে মেয়রের স্ত্রী বলে দাবি করেন। এরপর ৩১ জানুয়ারি মীমের দুই বোন জান্নাতুন নাইম ও জান্নাতুন ফেরদৌসকে নওগাঁ ও ঢাকা থেকে আটক করে পুলিশ।
নিখোঁজ পৌর মেয়রের লাশ মিলল আজিমপুর গোরস্তানে!
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন