চয়ন সেনগুপ্ত
কবির হৃদয়জুড়ে থাকে সহস্র সাহসী বিশ্বাস। অন্তর্লোকে শুরু হয় তুমুল তোলপাড়। তার অন্তর্দৃষ্টির আলোর নাচন ছড়িয়ে পড়ে প্রকৃতির পরতে পরতে। তার মানবিক বোধের কর্ষণে তৈরি হয় প্রেম-প্রীতি-ভরসার অমিয় বন্ধন। কবি তখন হয়ে উঠেন নিরন্তর হয়ে উঠার বিধাতা। কবি হলেন ব্যথার এবং বোধনের বিধি। তার কষ্টে, তার সঙ্গ-নিঃসঙ্গতায় পাখি ও প্রকৃতি, মেঘ-বৃষ্টি, আকাশ-বাতাস, তীর ও তেপান্তর, নদী ও নারী, মানুষের মন ও মাটি, সকল কিছু আপন হয়ে, বন্ধু হয়ে, দূত হয়ে কবির পাশে দাঁড়ায়। কবি কালিদাসের মেঘদূত কাব্যে আমরা দেখতে পাই জলভারনত মেঘের সঙ্গে কবির বিরহ-বন্দনার গভীর সম্পর্ক। কালে কালে মেঘের অনুষঙ্গে, উপমায় কবির লেখনী হয়ে উঠে নানারঙে রাঙানো শৈল্পিক তুলির উদ্ভাস। আকাশ, বাতাস আর আলোর ঝলকানিতে মেঘ যখন হাজার রূপের রোশনাই ছড়ায়, মেঘ যখন জোসনার এবং সন্ধ্যার বাতাস তাড়িত-মেঘমালা হয়, কবিরা তখন সংগোপনে কথা বলেন। এ কথা অনর্গল চলে মেঘের সাথে। সন্ধ্যায়, সকালে, ভর দুপুরে, শাণিত ধবধবে চাঁদনী রাতে, ঝড়ো বাতাসে, বৃষ্টিতে মেঘের নানা গড়নে ও রঙে কবিদের হৃদয়-মন উতলা হয়ে উঠে। বিনির্মাণ চলতে থাকে অন্তর-বাইরে। একটা পাখির মৃত্যুদৃশ্যের আচমকা শোকে রামায়ণের বাল্মীকি শোকগাথা রচনা করেছিলেন। আবার অশোক বনে বন্দিনী সীতার বিরহে রামচন্দ্র যখন ব্যাকুল, সেই বিরহ-বিচ্ছেদের অনুষঙ্গে বাল্মীকি পর্বতের মাথায় বিছানো সাদা মেঘদলকে উত্তরীয় বলেছিলেন। কবি কালিদাস অন্ধ-কামজ বেদনায় যক্ষের বয়ানে অলকাপুরীতে যক্ষপ্রিয়ার নিকট আর্তনাদের বার্তা পৌঁছাতে জলভারনত মেঘকে বাহন করেছেন। আষাঢ়ের প্রথমদিনে পূর্বমেঘ থেকে উত্তরমেঘ অবধি কবির অজস্র আকুতি। রামগিরিতে দাঁড়িয়ে নির্বাসিত যক্ষ মেঘের জন্ম নিয়ে বলছেন……
‘হে মেঘ জানি আমি ভুবনবিশ্রুত তুমি যে পুষ্কর-আবর্তের
বংশোজাত, আর সেবক ইন্দ্রের, ইচ্ছেমতো নাও নানা রূপ।’
এই পুষ্কর-মেঘ হলো জলভারনত স্ফীত মেঘ। কবি এমন স্ফীত ঐরাবত তুল্য মেঘদলকে সখ্যতায় সতকর্তায় সঞ্চালন করেছেন।
বাংলাসাহিত্যে কাব্যে, কবিতায়, ছড়ায়, ছোট গল্পে, গদ্যেকবি, ছড়াকার এবং ঔপন্যাসিকগণ মানুষের দুঃখ-বেদনা-কান্নার আবহ-অনুষঙ্গকে মেঘের হাজার রূপের সঙ্গে মিশিয়ে প্রকাশ করেছেন। প্রাচীন সাহিত্য থেকে আধুনিক সাহিত্য। মহাকবি বাল্মীকি থেকে কালিদাস। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবি-ছড়াকার সুকুমার রায় থেকে আলম তালুকদার মেঘের সঙ্গে সম্পর্ক পরম্পরায় সকলে যেন একসূত্রে গাঁথা। রবীন্দ্রনাথ যখন মেঘকে সঙ্গী করেন, সমস্ত পৃথিবীকে মেঘলোকে উধাও করেন, অপেক্ষার দুয়ারে বসে বসে মেঘের পরে মেঘ জমান, সেসময় কবি-ছড়াকার সুকুমার রায় তার ছড়ায় মেঘের মরণকে আবিষ্কার করেন। আর আলম তালুকদার তার ছড়ায়-ছন্দে তখন যাদুকর মেঘের পদাবলী রচনা করেন। রবীন্দ্রনাথ সারাজীবন তার প্রায় সমগ্র সৃষ্টিতে হয়ে উঠেছেন মেঘশিল্পী। ইংরেজ কবি পি.বি. শেলী এবং উইলিয়াম ওয়ার্ডস্ওয়ার্থ দু’জনের মেঘ নিয়ে দুটি অমর কবিতা রয়েছে। তারাও মেঘের বংশ হয়েছেন। বৃষ্টি, মেঘ আর বাতাসে মিশে একাকার হয়েছেন। পি.বি. শেলীর রচিত “ঞঐঊ ঈখঙটউ” এবং উইলিয়াম ওয়ার্ডস্ওয়ার্থ রচিত ….. “ I WANDERED LONELY AS A CLOUD
মেঘের বর্ণনায় পি.বি. শেলী লিখেছেন যে,
Iam the daughter of Earth and Water,And nursling of the Sky,
I pass throughthe poresof the ocean and shores,
I change but Icannot die.
রোমান্টিক কবি ওয়ার্ডস্ওয়ার্থ নির্ভার মেঘ হয়ে ভেসে ভেসে দশ হাজার ফুটন্ত সোনামাখা ড্যাফোডিল, পাহাড় চূড়া, মানুষের ভিড়, ঝিক্মিক্ তারা, নদীর ঢেউ দু’চোখ ভরে দেখতে দেখতে সানন্দে বলেছেন
I gazed and gazed but little thought
What wealth the show to me had brought:
আবার মেঘশিল্পী রবীন্দ্রনাথ বলেছেন যে, মেঘ হলো গগনচারী, স্বাধীন এবং কখনো কখনো আকাশের নকিব। তার ‘গৃহত্যাগী মন মুক্তগতির মেঘপৃষ্ঠে আসন নিয়েছে।’ কবির দগ্ধ মেঘ, রঙের পরে রঙ মাখানো মেঘ, গুরু গুরু মেঘ, শ্রাবণ মেঘ, আশ্বিনের বৃষ্টিহীন চিকন-সাদা মেঘের ভেলা, বুকে বুকে জড়িয়ে আকাশের কপাল জুড়ে মেঘের যাওয়া- আসা, ওড়না ওড়ানো দিগঙ্গনার মেঘ, মহাপ্রলয়ের জয়পতাকার মতো মেঘ, অলৌকিক বাইসন- মোষ মেঘ, কালো গাভীর মতো মেঘ, স্ফীত কেশর সিংহের মতো মেঘ, সঙ্গী মেঘসহ রবীন্দ্রনাথের সকল মেঘদল একসময় প্রভুর কাছে একটি মাত্র নমস্কারে নত হয়। তখন বিনম্র প্রার্থনার অনুষঙ্গে শ্রাবণের মেঘ ভেসে উঠে:
‘ঘন শ্রাবণমেঘের মতো রসের ভারে নম্র নত
একটি নমস্কারে, প্রভু, একটি নমস্কারে
সমস্ত মন পড়িয়া থাক্ তব ভবনদ্বারে’ (পূজা পর্বের গান)
মেঘে মেঘে কবির সকল বেলা নানা রঙে রঞ্জিত। তার ছোট গল্প- ‘মেঘ ও রৌদ্র’- এ শিক্ষক শশিভূষণের সঙ্গে দশ বছরের ছাত্রী গিরিবালার অসম প্রেমকাহিনী যেন চঞ্চল রৌদ্র ও চঞ্চল মেঘের মতো। যেন…..‘শুভ্র স্ফীত মেঘ আকাশের প্রান্তভাগে স্তূপাকার হইয়া পড়িয়া আছে।’
এছাড়া ‘ভিখারিনী’, অতিথি দুরাশা, প্রতিবেশিনী, আপদ, হৈমন্তী ইত্যাদি গল্পে মেঘের নানা অনুষঙ্গ এসেছে চরিত্রের হাসি-কান্নার দোলাচলে। ১৮৯২ সাল। ১২ জ্যৈষ্ঠ, বোলপুরে বসে কবি ছিন্নপত্রে লিখলেন…..‘তখন সূর্য অস্ত গেছে, কিন্তু অন্ধকার হয়নি। একবারে দিগন্তের প্রান্তে যেখানে গাছের সার নীল বর্ণ হয়ে দেখা যাচ্ছে তার ওপরেই ঠিক একটি রেখামাত্র খুব গাঢ় নীল মেঘ উঠে খুব চমৎকার দেখতে হয়েছে।….. ঠিক যেন নীল চোখের পাতার ওপরে নীল সুরমা লাগিয়েছে।’
জাপান যাত্রী : পত্র-৬ বর্ণনায় পাই…..
‘আকাশের দিগবলয়কে বলি উলঙ্গতা। ওখানে মেঘে মেঘে রূপের এবং রঙের অহেতুক বিকাশ। এ যেন গানের আলাপের মতো, রাগরাগিণীর আলাপ চলছে…… তাল নেই, আকার আয়তনের বাঁধাবাঁধি নেই, ….কেবলমাত্র মুক্ত সুরের লীলা।’
এরপর কবি-ছড়াকার সুকুমার রায়ের মেঘ বর্ণনায় পাই মেঘের মরণের কথা। জলভরা মেঘ থেকে যখন বৃষ্টি ঝরে যায়, তখন মেঘের মরণ হয়। মেঘের শিশুরা আকাশ-দোলনায় ঘুমায়। ভোরের সূর্য আবার মেঘশিশুদের ঘুম ভাঙায়। সকাল-বিকালে আকাশে মেঘের মেলা জমে। মেঘের নৌকা নানা রঙের পাল তুলে চলে। জোসনার মেঘ পাল্লা দিয়ে চলে চাঁদের সঙ্গে। যাবে অকুলের সন্ধানে। কবি আগল ভাঙা পাগল মেঘ সম্পর্কে বলছেন যে….
‘ঝড়ের মুখে স্বপন টুটে আঁধার আসে ঘিরে
মেঘের প্রাণে চমক আনে আকাশ চিড়ে চিড়ে।
বুকের মাঝে শঙ্খ বাজে- দুন্দুভি দেয় সাড়া!
মেঘের মরণ ঘনিয়ে নামে মত্ত বাদল ধারা।’
কবির ছোট মেঘ, বাতাসের কানে কানে কথা বলা অবুঝ মেঘ, ধারি মেঘ, বুড়ো মেঘ, ঢিপি মেঘ, মিটিং করা মেঘ, জটাধারী মেঘ, গুরু গুরু মেঘ, জড়ো মেঘ, চারদিক হানা দেয়া হড়্ হড়্-কড়্ কড়ে মেঘ যেন আকাশের সমস্ত নীলবসনা উড়িয়ে দিতে চায়।
সুকুমার রায় তার ‘মেঘের খেয়াল’ ছড়ায় লিখলেন যে…..
‘কি যে ভাবে চুপচাপ, কোন ধ্যানে থাকে-
আকাশের গায়ে গায়ে কত ছবি আঁকে।
কত আঁকে কত মোছে, কত মায়া করে,
পলে পলে কত রঙ কত রূপ ধরে।।’
পুরাকালে মেঘের সঙ্গে হাতির উপমা ছিল একটা রীতি। কথিত আছে, পুরাকালে হাতিদের ডানা ছিল এবং ডানায় ভর দিয়ে পাখির মতো সারা আকাশে তারা উড়ে বেড়াতো। কোনো এক তপস্যামগ্ন মুনির অভিশাপে হাতির ডানা দুটি খসে যায়। এই পৌরাণিক রীতির সমকালীন সফল প্রয়োগ করেছেন খ্যাতিমান ছড়াকার আলম তালুকদার তার ‘মেঘের যাদু’ ছড়ায়। এখানে তিনি অসীম যাদুকর মেঘের মধ্যে দেখতে পান দশটা হাতির শুঁড়, দশটা ঘোড়ার লেজ, দশটা ভালুকের হিংস্র রূপ, দশটা বাঘের ভয়ংকর যুদ্ধংদেহী মূর্তি, মেঘে মেঘে দশটা পাহাড়ের নির্মাণ, সেই দশ পাহাড়ের চূড়ায় বসা দশটি ঈগল বসার অবয়ব। কালো মেঘের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মধ্যে আলম তালুকদার পশুর রাজা সিংহের দানবীয় রূপ দেখতে পেয়েছেন। ‘মেঘের কালো’ ছড়ায় সন্ত্রাসী মেঘ নীল আকাশকে অগ্নিগর্ভ করে ধমক দিয়ে অশুভ ইঙ্গিত করছে কবিকে ….
‘মেঘের কালো হিসহিসানি
আকাশ জমিন অদ্য
বন্দি হয়ে বেবাক জীবন
ভুলে সরল পদ্য।
চিরিক দিয়ে আকাশ ফাটে-
অগ্নিগিরি চমকায়
নীল আকাশের সন্ত্রাসী রূপ
কেবল আমায় ধমকায়।’
রবীন্দ্রনাথ যখন নীল আকাশের দিগবলয়কে মেঘের বহুমাত্রিক রঙ ও রূপে সাজিয়ে মেঘের ডাকে সাড়া দিয়েছেন, একালে বসে আলম তালুকদার মেঘের পদাবলী রচনা করলেন নতুন বৈদগ্ধে। মেঘের যে সহস্র ঢঙের রংমালা, বহুরূপী উদ্ভাস তার সঙ্গে কবির কষ্টের স্বপ্নগুলো এলোমেলো খেলা করে। মেঘদূতের কবির মতো আলম তালুকদারও মেঘের সঙ্গে আলাপ করেন। চিরায়ত কবির অন্তর দিয়ে তিনি মেঘের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেন।
মেঘশিল্পী : পরম্পরায় কবি-ছড়াকার আলম তালুকদার
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন